শর্তহীন সত্য বা সর্বজনীন সত্য বলে কী আদৌ কোন কিছু আছে?



প্রশ্ন: শর্তহীন সত্য বা সর্বজনীন সত্য বলে কী আদৌ কোন কিছু আছে?

উত্তর:
শর্তহীন সত্য বা সর্বজনীন সত্য বিষয়টি বুঝবার জন্য আমাদের অবশ্যই এর সংজ্ঞা থেকে শুরু করতে হবে। অভিধান অনুযায়ী সত্য হলো “কোন সত্য ঘটনা বা বাস্তবতার সাথে সাদৃশ্য ভাব; একটি বিবৃতি যা প্রমাণিত এবং সত্য হিসাবে গ্রহণযোগ্য।” কিছু সংখ্যক লোক বলতে পারেন যে, অনুভূতি এবং বিশ্বাস ছাড়া বাস্তব সত্য বলে কিছু নেই। আবার অন্যরা যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করতে চেষ্টা করতে পারেন যে, অবশ্যই শর্তহীন বা সর্বজনীন বাস্তবতা বা সত্য বলে কিছু একটা থাকতে হবে।

এ বিষয়ে একটি দৃষ্টিভঙ্গি এই কথা বলে যে, শর্তহীন বিষয় বলে কিছু নেই যা বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করে থাকে। এই দৃষ্টিভঙ্গি যারা ধারণ করেন তারা বিশ্বাস করেন যে, সব কিছুই কোন না কোন কিছুর সাথে জড়িত, আর সেই কারণে সত্যিকার অর্থে বাস্তবতা বলে কিছু থাকতে পারে না। সেই জন্য , যদি কোন কাজ ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক, ঠিক অথবা বেঠিক/ভুল হয় তবুও সেখানে চূড়ান্তভাবে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য কোন নৈতিক শর্ত কিংবা কোনরূপ কর্তৃত্ব থাকে না। এরূপ দৃষ্টিভঙ্গি “অবস্থানমাফিক বিশ্বাস”-এর প্রতি পরিচালিত করে থাকে এই বিশ্বাসে যে, ঠিক বা ভুল যা-ই হোক না কেন তা কোন না কোন অবস্থা/প্রেক্ষাপটের সাথে জড়িত। ঠিক বা ভুল বলে কিছু নেই। তাই, যে সময়ে যা কিছু অনুভব করা হয় অথবা প্রতিভাত হয়, তা সেই অবস্থার বিবেচনায় ঠিক বিষয় বলে প্রতিভাত হয়ে থাকে। অবশ্যই “অবস্থানমাফিক বিশ্বাস “মানসিকভাবে এবং জীবন ধারণে ভাল যা কিছু অনুভূত হয়” তার সমাজ এবং ব্যক্তিজীবনের উপর একটি ধ্বংসাত্মক প্রভাব রয়েছে। এটি হচ্ছে আধুনিকীকরণ-পরবর্তী একটি অবস্থা যা একটি সমাজ গঠন করে যার মধ্যে রয়েছে মূল্যবোধ, বিশ্বাস, জীবনধারণ প্রণালী এবং যেখানে সত্য একইভাবে বৈধ্যতার দাবী করে থাকে।

এ বিষয়ে অন্য দৃষ্টিভঙ্গির ধারণা এই যে, এমন কিছু শর্তহীন বাস্তবতা এবং মান বা গুণাগুণ রয়েছে যেগুলো যা যা সত্য অথবা সত্য নয় সেগুলোকে সংজ্ঞায়িত করে থাকে। তারা যেভাবেই ঐ সব শর্তহীন মাত্রা বা গুণগুলোকে পরিমাপ করে থাকুন না কেন কাজগুলো সত্য অথবা মিথ্যা হওয়ার জন্য দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হতে পারে। শর্তহীন সম্পূর্ণতা বা বিশুদ্ধতা বলে যদি কিছু না থাকে তাহলে বাস্তবতা, আসন্ন বিশৃঙ্খলতা বলেও কিছু নেই। উদাহরণ হিসাবে ভার বা অভিকর্ষ নিয়মটির কথা ধরা যেতে পারে। এটি যদি শর্তহীন না হতো তাহলে আমরা কোথাও নড়াচড়া করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা অবধি কোন একটি জায়গায় আমরা দাঁড়াতে পারব না কি বসতে পারব সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারি না। অথবা সব সময় দুই যোগ দুই সমান সমান যদি চার না হয় তাহলে সভ্যতা বা সংস্কৃতির উপর এর প্রভাব হবে সর্বনাশমূলক। বিজ্ঞান ও পদার্থবিদ্যার নিয়ম-কানুনগুলো হয়ে পড়বে অপ্রাসঙ্গিক বা অবাস্তব এবং বাণিজ্য বা ব্যবসায় হয়ে পড়বে অসম্ভব। আর এমনটি ঘটলে কী বিশৃঙ্খলময় অবস্থারই না সৃষ্টি হবে! কৃতজ্ঞতার বিষয় এই যে, দুই যোগ দুই সমান সমান চারই হয়ে থাকে। এটি একটি শর্তহীন বা সর্বজনীন সত্য বিষয় এবং এটিকে দেখতে পারা যায় এবং বুঝতেও পারা যায়।

কোথাও কোন শর্তহীন সত্য বা সর্বজনীন সত্য নেই- এরূপ বিবৃতি তৈরী করাই হচ্ছে একটি অযৌক্তিক বিষয়। আজকের দিনেও এমন অনেক লোক আছেন যারা সাংস্কৃতিক সম্পর্কবাদ বা অপেক্ষবাদকে সাদরে গ্রহণ করেন যেটি যে কোন ধরনের সর্বজনীন সত্যকে অস্বীকার করে থাকে। যারা বলে, “শর্তহীন সত্য বা সর্বজনীন সত্য বলে কিছু নেই” তারা লোকদের খুবই মজার এই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে থাকেন যে, “আপনি কী শর্তহীনভাবে ঐ বিষয়ে নিশ্চিত?” যদি তারা এই প্রশ্নের উত্তরে হ্যাঁ বলে থাকেন তাহলে তারা ইতোমধ্যেই একটি শর্তহীন বিবৃতি তৈরী করেছেন যেটি নিজেই শর্তহীন বিষয়ের অস্তিত্বকে বুঝিয়ে থাকে। তারা এরূপ কথা বলে থাকেন যে, শর্তহীন বা সর্বজনীন সত্য বলে কিছু নেই। এর মধ্য দিয়ে এটিই প্রকাশ পায় যে, এটিই হচ্ছে এক এবং অদ্বিতীয় শর্তহীন সত্য বা সর্বজনীন সত্য।

একান্ত ব্যক্তিগত বিরোধ বা বিতর্ক থাকার বাইরেও কতিপয় যৌক্তিক সমস্যা রয়েছে যেগুলো অবশ্যই কাউকে না কাউকে বিশ্বাস করার মধ্য দিয়ে জয় করতে হবে যে, শর্তহীন অথবা সর্বজনীন সত্য বলে কিছু নেই। একটি বিষয় হলো সকল মানবজাতিরই সীমিত জ্ঞানবুদ্ধি এবং একটি সুনির্দিষ্ট মন বা অন্তর রয়েছে। আর তাই তারা যৌক্তিকভাবে শর্তহীন নেতিবাচক কোন বিবৃতি তৈরী করতে পারে না। কোন ব্যক্তি যৌক্তিকভাবে বলতে পারেন না যে, “ঈশ্বর বলে কেউ নেই” (যদিও এমনটি অনেকেই করে থাকেন), কারণ, এরূপ বিবৃতি তৈরী করার জন্য তার শুরু থেকে শেষ অবধি এই মহাবিশ্ব সম্বন্ধীয় সম্পূর্ণ ও শর্তহীন জ্ঞান থাকতে হবে। যেহেতু এটি অসম্ভব, তাই কেউ যৌক্তিকভাবে যা বলতে পারে তা হলো- “আমার যে সীমিত জ্ঞান আছে, তাতে আমি বিশ্বাস করি না যে, ঈশ্বর বলে কেউ আছেন।”

শর্তহীন সত্য বা সর্বজনীন সত্য অস্বীকার করার অন্য সমস্যাটি এই যে, আমরা আমাদের নিজেরদের বিচার-বুদ্ধিতে, সত্যনির্ভর অভিজ্ঞতায় যা সত্য বলে জানি এবং আমরা এই বাস্তব বিশ্বের মধ্যে যা কিছু দেখি তার সাথে এটি মানিয়ে নিতে ব্যর্থ। শর্তহীন বা সর্বজনীন সত্যের মত যদি কিছু না-ই থাকে তাহলে চূড়ান্তভাবে অন্য কোন কিছু সম্বন্ধে ঠিক বা বেঠিক/ভুল বলেও কোন কিছু নেই। আপনার জন্য যা “সঠিক” হতে পারে তা যে আমার জন্যও “সঠিক” হবে তার কোন মানে নেই। এই ধরনের সম্বন্ধবাদ বা অপেক্ষবাদ যখন মর্মস্পর্শীরূপে প্রতিভাত হয় তখন এটি যে অর্থ প্রকাশ করে তা হলো প্রত্যেকেই বেঁচে থাকবার এবং সে যা সঠিক বলে চিন্তা করে সেই বিষয়ে নিজের কিছু নিয়ম-কানুন তৈরী করে নেয়। অবশ্যম্ভাবীরপে সঠিক বিষয় সম্বন্ধে কোন এক ব্যক্তির ভাবনা-চিন্তা বা কল্পনা অতি দ্রুতই অন্যা কারো সাথে বিরোধপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। একটু ভেবে দেখুন তো, রাস্তায় লালবাতি জ্বলা সত্ত্বেও যদি আমি ঐ সংকেত দেওয়া বাতিগুলোকে উপেক্ষা করি তাহলে আমার প্রতি কী ঘটতে পারে? এমনটি করলে আমি অবশ্যই আমার জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়ে থাকি। অথবা ধরুন, আমি এমনটি চিন্তা করতে পারি যে, আপনার কোন কিছু চুরি করা আমার জন্য ঠিক বিষয় এবং অন্যদিকে আপনি চিন্তা করতে পারেন যে, এমনটি করা আমার জ্ন্য ঠিক নয়। এ থেকে স্পষ্টভাবে বুঝা যায় যে, ঠিক এবং বেঠিক বা ভুল বিষয় সম্পর্কে আপনার ও আমার চিন্তার মাপকাঠি বা মানদন্ড পরস্পর সংঘাতপূর্ণ। যদি কোন শর্তহীন সত্য বা সর্বজনীন সত্য না-ই থাকে তাহলে আমাদেরও ভাল-মন্দ/ ঠিক-বেঠিক বিষয়ে কোনরূপ মানদন্ডও থাকে না যেখানে কোনরূপ জবাবদিহি করার প্রশ্ন আসতে পারে। আর এতে করে কোন বিষয় সম্পর্কে আমরা কখনই নিশ্চিত হতে পারব না। এক্ষেত্রেও লোকেরা যা খুশী তা-ই করতে পারে, যেমন- খুন, ধর্ষণ, চুরি, মিথ্যা বলা, প্রতারণা করা ইত্যাদি, এবং কেউ-ই বলতে পারবে না যে, ঐ সব বিষয়গুলো বেঠিক বা ভুল। কোন শাসনব্যবস্থা বা সরকার ব্যবস্থা, আইন-কানুন এবং ন্যায়বিচার নাও থাকতে পারে, তবুও কারো এমন কথা বলা উচিত নয় যে, সংখ্যালঘু জনসাধারণের উপর ক্ষমতা ও বলপ্রয়োগ করার অধিকার বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর রয়েছে। শর্তহীন সত্য বা সর্বজনীন সত্য ব্যতীত বিশ্বজগৎ হয়ে উঠবে আমাদের কল্পনারও অতীত ভয়ংকরতম।

আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই ধরনের সম্বন্ধবাদ বা অপেক্ষবাদ ধর্মের মধ্যে সন্দেহ সৃষ্টি করে যেখানে কারও কোন সত্য ধর্ম থাকে না এবং ঈশ্বরের সাথে সঠিক যোগাযোগ রাখারও কোন উপায় থাকে না। এতে করে সব ধর্মই মিথ্যা হয়ে পড়বে, কারণ তারা সকলেই জীবন-পরবর্তী বিষয়ের প্রতি মনোযোগী হওয়ার দাবী তৈরী করে থাকে। আজকের দিনে মানুষের পক্ষে এটি বিশ্বাস করা কোন বিরল বা অসামান্য বিষয় নয় যে, একই সরলরেখা বরাবর অবস্থিত ধর্মবিরোধী দু’টি বিষয়ের উভয়ই সমানভাবে “সত্য” হতে পারে না, যদিও উভয় ধর্মই এই দাবী করে যে, স্বর্গে যাবার একমাত্র পথ কেবলমাত্র তাদেরই রয়েছে অথবা তারা এই শিক্ষা প্রদান করে যে, তারা উভয়ই মোটামুটিভাবে বিপরীতমুখী “সত্যগুলো” শিক্ষা দিয়ে থাকে। যে সব লোক শর্তহীন সত্য বা সর্বজনীন সত্যে বিশ্বাস করে না তারাই এই সব দাবীগুলো উপেক্ষা করে এবং অতিশয় সহ্যকারী সর্বজনীনবাদকে সাদরে গ্রহণ করে যা শিক্ষা দেয় যে, সব ধর্মই সমান এবং সমস্ত পথই স্বর্গে যেতে পরিচালনা দান করে। যে সব লোক এই বিশ্বদর্শন বা সর্বজনীনতাকে সাদরে গ্রহণ করে তারা প্রচন্ডভাবে সুসমাচার প্রচারকারী খ্রীষ্টিয়ানদের বিরোধিতা করে যেখানে বলা হয়েছে যে, যীশুই হলেন, “একমাত্র পথ ও সত্য ও জীবন” এবং তাই তিনিই (যীশুই) হলেন সত্যের চূড়ান্ত প্রকাশ এবং একমাত্র পথ যাঁর মধ্য দিয়ে যে কেউ স্বর্গে যেতে পারে (যোহন ১৪:৬ পদ)।

সহনশীলতা অধুনা-পরবর্তী সমাজে একটি আন্তরিক ও আদরণীয় গুণে পরিণত হয়েছে যার একটি হচ্ছে বিশুদ্ধ বা শর্তহীনতা এবং তাই সহনশীলতা হচ্ছে একটি মন্দ বা খারাপ বিষয়। যে কোন ধরনের যুক্তিহীন বিশ্বাস, বিশেষ করে শর্তহীন বা সর্বজনীন সত্যে বিশ্বাস প্রায়ই বলবে যে, আপনি যতক্ষণ না অন্যদের উপরে আপনার বিশ্বাস স্থাপন করার চেষ্টা করেন ততক্ষণ আপনি যা চান তা বিশ্বাস করতে সব কিছুই ঠিক থাকে। কিন্তু এরূপ দৃষ্টিভঙ্গি নিজেই যা ঠিক ও বেঠিক বা ভুল সেই সম্পর্কিত বিষয়টিই একটি বিশ্বাস এবং যারা এরূপ দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করেন তারা সুনির্দিষ্টভাবে তা অন্যদের উপর স্থাপন করার চেষ্টা করে থাকেন। তারা আচার-ব্যবহারের একটি মানদন্ড দাঁড় করান এবং অন্যদের প্রভাবিত করেন যেন তারা সেটি অনুসরণ করে; এর পরিবর্তে তারা যে বিষয়টি সমর্থন করার দাবী করেন তা অমান্য করে মূলতঃ অন্যের ব্যক্তি-বিরোধপূর্ণ অবস্থানকে তুলে ধরেন। এমন ধরনের বিশ্বাস তারা ধারণ করেন, কারণ সাধারণ অর্থে তারা তাদের কাজের জন্য অন্য কারো কাছে কোনরূপ জবাবদিহি করতে চান না। যদি কোন শর্তহীন সত্য বা সর্বজনীন সত্য থেকে থাকে তাহলে ঠিক এবং বেঠিক বা ভুলেরও একটি শর্তহীন মাপকাঠি আছে এবং আমরা অবশ্যই এই সব মানদন্ডের নিকট জবাব দিতে বাধ্য। এই জবাবদিহিতার বিষয়টি হলো তা-ই যেটি লোকেরা সত্যিকার অর্থে সর্বজনীন সত্যকে প্রত্যাখ্যান করার সঙ্গে সঙ্গে ঐ বিষয়টিও প্রত্যাখ্যান করে থাকেন।

শর্তহীন সত্য বা সর্বজনীন সত্য এবং সাংস্কৃতিক সম্বন্ধবাদ বা অপেক্ষবাদ অস্বীকার করার বিষয়টি আসে একটি সমাজের যৌক্তিক ফলাফলকে সঙ্গে করে যা জীবনের জন্য ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণের মত করে বিবর্তনবাদ বা বিবর্তন তত্ত্বকে সাদরে গ্রহণ করে থাকে। যদি প্রাণিবিজ্ঞানগত বিবর্তন সত্য হয় তাহলে জীবনের কোন মানে থাকে না, আমাদের কোন লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য থাকে না এবং কোথাও কোনরূপ শর্তহীন ঠিক বা ভুল বিষয় থাকতে পারে না। এরফলে মানুষ তার সন্তুষ্টি অনুসারে বাঁচার জন্য স্বাধীন হয়ে পড়ে এবং সে তার কাজের কোন জবাব দিতে বাধ্য থাকে না। এত বেশী পাপপূর্ণ মানুষ ঈশ্বরের অস্তিত্ব এবং শর্তহীন সত্য বা সর্বজনীন সত্যকে অস্বীকার করলে তাতে কিছু যায়-আসে না, কিন্তু এমন একদিন আসবে যখন তাদের অবশ্যই চূড়ান্ত বিচারের জন্য তাঁর (ঈশ্বরের) সম্মুখে দাঁড়াতে হবে। পবিত্র বাইবেল এই কথা ঘোষণা করে যে, “ঈশ্বর সম্বন্ধে যা জানা যেতে পারে তা মানুষের কাছে স্পষ্ট, কারণ ঈশ্বর নিজেই তাদের কাছে তা প্রকাশ করেছেন। ঈশ্বরের যে সব গুণ চোখে দেখতে পাওয়া যায় না, অর্থাৎ তাঁর চিরস্থায়ী ক্ষমতা ও তাঁর ঈশ্বরীয় স্বভাব সৃষ্টির আরম্ভ থেকেই পরিস্কার হয়ে ফুটে উঠেছে। তাঁর সৃষ্টি থেকেই মানুষ তা বেশ বুঝতে পারে। এর পরে মানুষের আর কোন অজুহাত নেই। মানুষ তাঁর সম্বন্ধে জানবার পরেও ঈশ্বর হিসাবে তাঁর গৌরবও করে নি, তাঁকে কৃতজ্ঞতাও জানায় নি। তাদের চিন্তাশক্তি অসাড় হয়ে গেছে এবং তাদের বুদ্ধিহীন অন্তর অন্ধকারে পূর্ণ হয়েছে। যদিও তারা নিজেদের জ্ঞানী বলে দাবী করেছে তবুও আসলে তারা মুর্খই হয়েছে” (রোমীয় ১:১৯-২২ পদ)।

শর্তহীন বা সর্বজনীন সত্যের অস্তিত্বের পক্ষে কী কোন চিহ্ন বা লক্ষণসমূহ আছে? হ্যাঁ, অবশ্যই আছে। প্রথমতঃ মানুষের বিচারবুদ্ধি বা বিবেক, যার অর্থ আমাদের মধ্যে এমন বিশেষ “কিছু” আছে যা আমাদের বলে যে, বিশ্বজগতের উচিত একটি সুনির্দিষ্ট পথে থাকা যেখানে কিছু কিছু বিষয় হচ্ছে সঠিক এবং কিছু কিছু বিষয় হচ্ছে মিথ্যা বা ভুল। আমাদের বিচারবুদ্ধি বা বিবেক আমাদের এভাবে প্রভাবিত করে যে, দুঃখ-কষ্ট, খিদের জ্বালা, ধর্ষিত হওয়া, ব্যথা-বেদনা এবং খারাপ ইত্যাদি বিষয়গুলোর সাথেও কিছু কিছু ভুল বিষয় রয়েছে যেগুলো আমাদের ভালবাসা, উদারতা, সহানুভূতি এবং শান্তির মত ইতিবাচক বিষয়গুলো সম্বন্ধে সচেতন করে তোলে এবং এগুলোর জন্য আমাদের প্রত্যেকের উচিত কঠোর পরিশ্রম ও চেষ্টা করা। এই বিষয়টি সব সময়ের জন্য পৃথিবীর সমস্ত সংস্কৃতির ক্ষেত্রেই সর্বতোভাবে সত্য ও প্রযোজ্য। পবিত্র বাইবেলের রোমীয় পুস্তকের ২:১৪-১৬ পদের মধ্যে মানুষের বিচারবুদ্ধি বা বিবেকের বিষয়ে বর্ণনা করা হয়েছে এভাবে: “অযিহূদীরা মোশির আইন-কানুন পায় নি, কিন্তু তবুও তারা যখন নিজে থেকেই আইন-কানুন মত কাজ করে তখন আইন-কানুন না পেয়েও তারা নিজেরাই নিজেদের আইন-কানুন হয়ে ওঠে। এতে দেখা যায় যে, আইন-কানুন মতে যা করা উচিত তা তাদের অন্তরেই লেখা আছে। তাদের বিবেকও সেই একই সাক্ষ্য দেয়। তাদের চিন্তা কোন কোন সময় তাদের দোষী করে, আবার কোন কোন সময় তাদের পক্ষেও থাকে। ঈশ্বর যখন যীশু খ্রীষ্টের মধ্য দিয়ে মানুষের গোপন সব কিছুর বিচার করবেন সেই দিনই তা প্রকাশ পাবে। আমি যে সুখবর প্রচার করি সেই অনুসারেই এই বিচার হবে।”

শর্তহীন সত্য বা সর্বজনীন সত্যের পিছনে দ্বিতীয় যে লক্ষণটি রয়েছে সেটি হচ্ছে বিজ্ঞান। সাধারণ অর্থে বিজ্ঞান হচ্ছে জ্ঞানের অনুসরণ বা জ্ঞানের পিছনে সময় কাটানো। আমরা যা জানি, এটি হচ্ছে প্রচুর অধ্যয়ন এবং আরও বেশী কিছু জানবার জন্য অনুসদ্ধান করা। তাই সব ধরনের বৈজ্ঞানিক অধ্যয়ন অবশ্যই আবশ্যিকভাবে হতে হবে এমন বিশ্বাস বা মতের উপর প্রতিষ্ঠিত যা বিশ্বাস করে যে, পৃথিবীতে বাস্তবধর্মী অস্তিত্বময় কিছু রয়েছে যেগুলো আবিস্কার করা যেতে পারে এবং সেগুলো প্রমাণও করা যেতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো শর্তহীনতা বা সম্পূর্ণতা ছাড়া অধ্যয়ন করতে কী-ই বা অবশিষ্ট থাকবে? কেউ কিভাবে জানতে পারবে যে, বিজ্ঞান তার আবিস্কৃত বা অনুসন্ধানে প্রাপ্ত বিষয়ে যে সিদ্ধান্তগুলো নিয়েছে তার সবই বাস্তবসম্মত বা সত্য? প্রকৃতপক্ষে, বিজ্ঞানের সমস্ত মূল বা প্রধান নিয়ম-কানুনগুলো শর্তহীন বা সর্বজনীন সত্যের অস্তিত্বের উপর নির্ভরশীল।

শর্তহীন সত্য বা সর্বজনীন সত্যের অস্তিত্বের স্বপক্ষে তৃতীয় যে চিহ্ন বা লক্ষণ রয়েছে তা হলো ধর্ম। পৃথিবীর সকল ধর্মই নিজ নিজ অবস্থান থেকে জীবনের অর্থ ও সংজ্ঞা প্রদান করতে চেষ্টা চালিয়ে থাকে। তারা সামান্য বা ছোট কোন কিছুর অস্তিত্বের তুলনায় অন্য কিছুর জন্য মানবজাতির আশা-আকাঙ্খা বা কামনা-বাসনাকে বেশী সমর্থন করে থাকে। ধর্মের মধ্য দিয়ে মানুষ ঈশ্বরের কাছে ভবিষ্যতের জন্য আশার বাণী বা প্রত্যাশা, পাপের ক্ষমা, সংগ্রাম বা যুদ্ধ-বিগ্রহ প্রভৃতির মধ্যে শান্তি এবং এগুলোর মধ্যকার অন্তর্নিহিত প্রশ্নগুলোর উত্তরের খোঁজ করে থাকে। ধর্ম হলো সত্যিকারভাবে একটি লক্ষণ বা চিহ্ন যা প্রকাশ করে যে, সবচেয়ে উত্তমভাবে বিবর্তিত পশু-পাখীর তুলনায় মানবজাতি অনেক বেশী কিছু। এছাড়াও এটি হচ্ছে ব্যক্তি ঈশ্বর ও উদ্দেশ্যপূর্ণ সৃষিটকর্তা ঈশ্বরের অস্তিত্বের বিষয়ে একটি উচ্চমানসম্পন্ন উদ্দেশ্যের লক্ষণ বা চিহ্ন যেখানে ঈশ্বর মানুষের মধ্যে এমন আকাঙ্খার বীজ বপন করেছেন যাতে করে মানবজাতি তাঁকে জানার জন্য আগ্রহী হয়ে ওঠে। আসল কথা হলো, বাস্তবিক সৃষ্টিকর্তা বলে যদি কেউ থেকেই থাকেন তাহলে তিনি অবশ্যই শর্তহীন বা সর্বজনীন সত্যের জন্য একটি মানের আদর্শ বা নমুনাস্বরূপ হয়ে উঠবেন এবং এটিই হচ্ছে তাঁর (ঈশ্বরের) ক্ষমতা যা ঐ সত্যকে প্রতিষ্ঠা করে থাকে।

সৌভাগ্যবশতঃ তেমন ধরনের একজন সৃষ্টিকর্তা রয়েছেন যিনি আমাদের কাছে তাঁর সত্য, তাঁর পবিত্র বাক্য অর্থাৎ বাইবেলের মধ্য দিয়ে প্রকাশ করেছেন। তিনি দাবী করেন যে, তিনি নিজেই সত্য এবং কেবলমাত্র যীশু খ্রীষ্টের সাথে ব্যক্তিগতভাবে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ সম্বন্ধ রাখার মধ্য দিয়েই শর্তহীন সত্য বা সর্বজনীন সত্য সম্পর্কে জানা সম্ভব। যীশু স্বয়ং দাবী করেন যে, ঈশ্বরের কাছে যাওয়ার জন্য তিনিই একমাত্র পথ, সত্য ও জীবন (যোহন ১৪:৬ পদ)। প্রকৃত সত্য এই যে, শর্তহীন বা সর্বজনীন সত্য আমাদের কাছে এই বিষয়টি তুলে ধরে যে, সর্বশক্তিমান ঈশ্বর বলে একজন রয়েছেন যিনি এই মহাকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং আমাদের কাছে নিজেকে প্রকাশ করেছেন যেন আমরা তাঁর (ঈশ্বরের) একজাত পুত্র যীশু খ্রীষ্টের মধ্য দিয়ে ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে জানতে পারি। আর এটিই হচ্ছে শর্তহীন সত্য বা সর্বজনীন সত্য।



বাংলা হোম পেজে ফিরে যান



শর্তহীন সত্য বা সর্বজনীন সত্য বলে কী আদৌ কোন কিছু আছে?